ভিয়েতনাম ভ্রমণ : হাওয়াই জাহাজে একাল সেকাল, প্রথম পর্ব
![]() |
| ভিয়েতনাম ভ্রমণ : প্রথম পর্ব |
কানাইলাল জানা
গত শনিবার ১১-১০-২৫ সন্ধ্যায় দমদম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে ফেসবুকে সপরিবার ভিয়েতনাম ভ্রমণের পোস্ট দেখে যাঁরা শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন প্রথমে তাঁদের প্রত্যেককে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।তো কৃতবিদ সাংবাদিক ও ইতিহাস সচেতন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় বলেতেন 'ব্যবহা'র বা 'ব্যবসা'র উচ্চারণে য-ফলা দিলে একটা আ-কার এসে যায় অতিরিক্ত তাই সঠিক উচ্চারণ হবে ববহার এবং ববসা। আমাদের ভিয়েতনাম উড়ান ছিল দমদম থেকে ব্যাঙ্কক এবং ব্যাঙ্কক থেকে হ্যানয়। প্রতি ক্ষেপে আড়াই ঘন্টা হলে যাতায়াতে শুধু বিমানে মোট সময় দশ ঘন্টা। আমি হতবাক হয়ে গেছি দেখে যে এই দশ ঘন্টায় বিমান সেবিকা এবং সেবকদের আপ্যায়ন ছিল শূন্য। সারাক্ষণ তাঁদের ব্যবহার নিয়োজিত ছিল ব্যবসায়। উড়ন্ত বিমানে দিনের আলোয় অথবা আলোআঁধারির মধ্যে রিসার্চ পেপারের মতো কিছু দেখে খাবার সাপ্লাই করছেন বেছে বেছে কিছু যাত্রীর মধ্যে। কিন্তু কিছুদিন আগেও তো ছিল বিমান সেবক এবং সেবিকারা প্রত্যেক যাত্রীকে কিছু না কিছু খাবার সরবরাহ করেছেন যেমন বিস্কুটের প্যাকেট, সফ্ট ড্রিংকস, কেক, চকলেট, রুটি, পাউরুটি এমনকি প্রাতরাশ বা দুপুরের খাবার পর্যন্ত। প্রাইভাটাইজেশান মানে কি মানবিকতার বিসর্জন? আপ্যায়ণকে হিমঘরে পাঠানো ? কি করে ভুলি আপ্যায়ণ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে এই শহরে: বাড়িতে গেলে অলকরঞ্জন দাশগুপ্ত - টুটবার্তা দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়- স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় - সোনামন মুখোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় - গীতা মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ- প্রতিমা ঘোষ, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় - বিজয়া- মুখোপাধ্যায়, আলোক সরকার- মিনু সরকার, পবিত্র মুখোপাধ্যায় - মিনু মুখোপাধ্যায়, দিব্যেন্দু পালিত- কল্যাণী পালিত, পবিত্র সরকার -মৈত্রেয়ী সরকার, সমীর রায়চৌধুরী - বেলা রায়চৌধুরী, তপন বন্দ্যোপাধ্যায় - কল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাত চৌধুরী -যূথিকা চৌধুরী, সৈয়দ কওসর জামাল - স্বপ্না সৈয়দ প্রমুখের আপ্যায়ণ। কবি শ্যামলকান্তি দাশ আবার ঘরভর্তি বইপত্র-র মধ্যেও বলেন : 'খাটে পা তুলে চক্করমেরে বসুন', তারপর আসতে থাকবে সরবৎ, মিষ্টান্ন এবং নানারকম খাবার। আপ্যায়ণ ছিল অফিসেও। খোলা হাওয়ার যুগে 'দেশ' পত্রিকার দপ্তরে সুনীলদা, শীর্ষন্দুদা, আকাশবাণীতে সৈয়দ কওসর জামাল থেকে সিদ্ধার্থ মাইতি, এমনকি এই সেদিন এ জি বেঙ্গলের চারতলায় যশোধরা রায়চৌধুরী। ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট সার্ভিসের উঁচু পদে থেকেও অনেকটা সময় বের করে কতোকিছু খাওয়াল,তার উচ্চমানের লেখা দুটি গদ্যগ্রন্থও দিল। না চাওয়া সত্ত্বেও তার গাড়ি ছেড়ে দিয়ে এল মেট্রোতে। বদলি গেল দিল্লি। এ মাসে তার অবসর। সবই থাকবে মনের মণিকোঠায়। 'রাজধানী এক্সপ্রেস','দূরন্ত এক্সপ্রেস' এবং হাল আমলে 'বন্দে ভারত' ট্রেনে তো দারুণ খাবার পরিবেশন হয়। কে বা খাওয়ায়, প্রয়োজনে টিকিটের সঙ্গে খাবারের দাম ধরে নিলেই হয়।
বিমানে শুকনো মুখে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে পড়ে একবার রবীন্দ্র সদনে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুখোমুখি অমিতাভ চৌধুরী ও মুনমুন সেন। মুখেমুখে ছড়া কাটেন অমিতাভ চৌধুরী: 'এক মুনে রক্ষা নেই তায় ডাবল মুন, মায়ের মতোই যেমন রূপ তেমনি তার গুণ।' না একই রকম প্রতিভা হয়তো নয় মা ও মেয়ের মধ্যে কিন্তু বন্দিদের চিত্র প্রদর্শনী এবং সংশোধনাগারের সঙ্গে তাঁর অন্য যোগাযোগ সুন্দর মনের পরিচয় হয়েই আছে। আসলে মুন বা চাঁদের কথা বলছি। চাঁদ দেখা যায়নি, তা না হলেও সারা বিশ্বে চাঁদকে নিয়ে কাব্যের শেষ নেই। আমার শুধু মনে পড়ে: 'চাঁদের এতো আলো তবু সে আমারে ডাকি, উতলা মাধবী রাতে মাগিছে হে মোর আঁখি!' চাঁদ না থাকলেও দেখা যায় নক্ষত্রখচিত আকাশ। তখন স্মরণে আসে 'বিভাস' চলচিত্রের গান: 'আজ তারায় তারায় জ্বলুক বাতি, আমার আঁধার সরিয়ে নাও। বন্ধ ঘরের দুয়ার ভেঙে আলোয় আমার ভরিয়ে দাও।' চাঁদের মতোই বা তার থেকে বেশি কাব্য জগৎ ভরে আছে মেঘের রাজ্যে। মন তবু কিছুটা ভাল হয় দিনের আলোয় জানলা দিয়ে মেঘের নানা ম্যাজিক দেখে। এই হয়তো নীল সমুদ্র থেকে ভেসে উঠছে সাদা পদ্ম তো পর মুহূর্তে কালো পাহাড়ের ঢালে শুম্ভনিশুম্ভর মহাযুদ্ধ, তারপরেই সাদা ও নীল রঙের খোকা খুকিদের হামাগুড়ি!
একটি টিভি সেট যে একটি দেশের ঐতিহ্য এবং মতাদর্শ তুলে ধরে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভিয়েতনাম: যে হোটেলে উঠেছি, ঘরের টিভি সেটে বেশ কিছু চ্যালেন। একটি চ্যালেন দেখায় কেবল ফুটবল খেলা। একটি পুরো ম্যাচ দেখি লিভার পুলকে ১-০ গোলে হারিয়ে দিল সুটন ইউনাইটেড। মহম্মদ সালাহ খেলা সত্ত্বেও। অন্য একটি ম্যাচে জুভেন্টাস ড্র করে অতি অনামি এক ক্লাবের সঙ্গে। বলতে চায় পেন্টাগনের তথা আমেরিকার যুদ্ধনীতিকে হারিয়ে দিতে পারে ছোট্ট দেশ ভিয়েতনাম, সে তো বটেই এখন চিন যদি বলে দাবিয়ে রাখবে সে-ও হবে না কখনোই গাইডের মতে। আর একটি চ্যানেল মি: ফিট। রোগ হলে তো চিকিৎসা চলবে কিন্তু রোগ যাতে ধরে তার জন্য আছে শুধু নাচের ক্লাস। গান গাইতে গাইতে নাচ: মহিলা পুরুষ কিংবা একসঙ্গে। সারা শরীর দুলিয়ে ছন্দে ছন্দে নাচ আর নাচ....

Comments
Post a Comment